বুধবার । ১৭ই জুন, ২০২৬ । ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩
যাদের ক্ষতি হয়েছে, পুষিয়ে দেওয়া হবে : জেলা প্রশাসক

নদী খননের মাটিতে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে ছিন্নমূল পরিবারগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ডুমুরিয়া প্রতিনিধি

‘আমাদের এখানে মাটি চাপা দেওয়ার পর খুব কষ্টে আছি। পেছনে যে ঘরগুলো আছে, সবার টয়লেট বন্ধ। ট্যাংকিগুলো মাটিতে ভরে গেছে। রান্না খাওয়া বন্ধ। বাইরে ইট পেতে রান্না করতে হচ্ছে। এরমধ্যে বৃষ্টি হলে রান্না একেবারে বন্ধ। ছেলে-মেয়েদের মুখে ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না।’

এভাবেই নিজেদের কষ্টের কথা বলছিলেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তপতি দাস। তিনি বলেন, ‘রাতের বেলায় গরমে অসুস্থ হয়ে পড়তে হচ্ছে, দিনেও কাজে যেতে পারি না। সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমরা খুব সমস্যার ভেতরে আছি।’

একই প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা মুন্নি বেগম বলেন, রান্নাঘর, টিন, বাথরুম ভেঙে মাটিতে ভরে গেছে। চার-পাঁচদিন ধরে এই অবস্থা। রান্না করতে সমস্যা হচ্ছে। আজ তারা ঘরের পেছনের মাটি সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঘরের মাটি আমাদের টানতে খুব কষ্ঠ হচ্ছে। গরীব মানুষ আমরা, কিষাণ (দিনমজুর) দিয়ে মাটি টানাবো সেই অবস্থাও নেই। আমার স্বামী অসুস্থ, কী করব? চার-পাঁচ দিন কষ্ট করে মাটি টানছি।

শুধু তপতি দাস আর মুন্নি বেগম নয়, একই সূরে নিজেদের কষ্টের কথাগুলো বলেছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে ভদ্রাসহ ৬টি নদীর সাড়ে ৮১ কিলোমিটার খনন কাজ চলছে। চুকনগর থেকে বরাতিয়া পর্যন্ত ভদ্রা নদীর পাড়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৪০০ ঘর রয়েছে। নদী খননের মাটি রাখার ফলে এসব ঘরের অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে ছিন্নমূল পরিবারগুলো।

ডুমুরিয়া বরাতিয়া এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, জানুয়ারি মাস থেকে নদী খননের কাজ শুরু হয়। কাজ চলছিল। হঠাৎ কয়েকদিন ধরে মাটির পাহাড় হয়ে গেল। তারা এমনভাবে মাটিগুলো রেখেছে, ঘরগুলো ভেঙে গেছে, বাথরুমের ট্যাংকিগুলো নষ্ঠ হয়ে গেছে। ওয়ালে মাটির চাপ পড়ে ফেটে গেছে। ভেকু গাড়ি যখন মাটি সরায় তখন ঘরগুলো কাঁপতে থাকে। এখানকার সবাই হতদরিদ্র।

প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা বেবি বেগম বলেন, টিনের চাল ভেঙে গেছে। মাটির কারণে রান্নার পরিবেশ নেই, টয়লেটে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। এই অবস্থায় আমরা কীভাবে এখানে বসবাস করব? বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না করেছি। এখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচ- গরমে ছেলে-মেয়েরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

আশ্রয়ণের বাসিন্দা চামেলী দাস বলেন, নদী খননের মাটির চাপে ঘরগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ঘরের পেছনে যেগুলো বাথরুম আছে, সব ভেঙে গেছে। আর আমি অসুস্থ, পেটে টিউমার হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় এই গরমে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। শিশুরা পড়াশোনা করতে পারে না।

ডুমুরিয়ার আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন বলেন, বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১২৫টি ঘর রয়েছে। এরমধ্যে ১০টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে যাওয়া ১০টি ঘর মেরামতে করে দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করছে। গতকাল এবং আজ দুইদিনে অধিকাংশ মাটি অপসারণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটা ঘর শঙ্কামুক্ত হয়ে গেছে। এখন আর মাটিতে ঘরের ক্ষতি করার মতো কোনো অবস্থা নেই।

এদিকে গত ১৫ জুন খুলনা গেজেটসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিউজ সংশ্লিষ্টদের নজরে এলে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘরের পেছেন দিক থেকে মাটি অপসারণের কাজ শুরু হয়। গতকার মঙ্গলবার ক্ষতিগ্রস্ত বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত সাংবাদিকদের বলেন, ‘যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে ভদ্রাসহ কয়েকটি নদী খননের কাজ চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। সরকার সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কিছু সুফলভোগীর ক্ষতি হয়েছে। সেটা দেখার জন্য সরেজমিনে আসা হয়েছে। এখানে যাদের ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো পুষিয়ে দেওয়া হবে।’




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন